আনিসুল হক: তোমারে দেব না ভুলিতে

0
8

মানুষের নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের প্রভাব তাঁর সব কাজের ওপর পড়ে। যেমন কেউ যদি নিখুঁত কাজ করতে ভালোবাসেন, দেখা যাবে তাঁর সব কাজই পরিপাটি হয়। করিৎকর্মা মানুষ স্বল্প সময়ে অনেক কাজ করে থাকেন। সাহসী মানুষ, সৃজনশীল মানুষ সাহসের সঙ্গে সৃজনশীল কাজ সম্পাদন করে থাকেন। চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের প্রভাব তাঁর জীবনের সর্বত্র ছাপ ফেলে। মরহুম আনিসুল হক ছিলেন চারিত্রিক দিক দিয়ে বহুমুখী বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাঁর সঙ্গ কাজ করতে গিয়ে, তাঁর সান্নিধ্যে এসে এর নমুনা দেখেছি।

আধুনিক ঢাকার রূপকার এবং সত্যিকারের নগরদরদি মানুষ ছিলেন আনিসুল হক। তিনি মানুষের কথা বলতেন, সমস্যার সমাধানে সচেষ্ট হতেন। উন্নয়নে বিশ্বাসী ছিলেন। নগরীর প্রতিটি কোণে ঘুরে ঘুরে নানা সমস্যা ও দুর্দশা চিহ্নিত করে সমাধানে ব্রতী হতেন। এভাবেই তিনি নগর সমস্যার সমাধান করতেন। নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়ন করাই ছিল তাঁর ব্রত। এই জনপদের আশা-আকাঙ্ক্ষা, অধিকার ও দাবির পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন নির্ভীকভাবে। তিনি ছিলেন মানুষের জন্য নিবেদিত একজন মানুষ এবং সর্ব অর্থেই একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। মানুষের জন্য এত নিবেদিত ও দরদি আরেকজন মানুষ সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যায়নি। তিনি ছিলেন গভীর প্রণোদনার উৎস। বহুমুখী কাজের মাধ্যমে ঢাকাকে এগিয়ে নেওয়ার পথিকৃৎ। তাঁর সঙ্গে নগরীর বহুমাত্রিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হতো। ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, পরিবহনব্যবস্থার উন্নয়ন, সিভিলাইজড সিটি, জনস্বাস্থ্য, শিশু, নারী, পথচারী, সাধারণ মানুষ, প্রশস্ত ফুটপাত ইত্যাদি বিষয়ে করণীয় নিয়ে আলোচনা হতো। তাঁর লক্ষ্য ছিল ঢাকার খাল–ঝিল–নদী উদ্ধার, সবুজ বেষ্টনী তৈরি। এক সভ্য ঢাকা নগরীর স্বপ্ন দেখতেন এবং প্রচণ্ড বাধা উপেক্ষা করে ক্রমশ এগোচ্ছিলেন।

সমাজে কাজের চেয়ে কথা বলার মানুষ বেশি। কিন্তু তিনি ছিলেন একজন কর্মবীর মানুষ। কাগজে-কলমে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন। ২০০৭-০৯ সালে এফবিসিসিআইয়ের সভাপতির দায়িত্ব পালনকালে এফবিসিসিআই ভবন, চেম্বারগুলোর কার্যালয় ও অ্যাসোসিয়েশনগুলোর কার্যালয়ের উন্নয়ন করেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল ফেডারেশনকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা। আনিসুল হকের সাহসী উক্তি দেখে মাঝেমধ্যে আমরা শঙ্কিত হতাম। কিন্তু পরিস্থিতি মোকাবিলা করতেন দারুণভাবে। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় যখন বহু ব্যবসায়ী বিপদে পড়লেন। অনেকে জেলে গেলেন। অনেকে দেশ ছেড়ে গেলেন। সেই সময় এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি থাকাকালে ব্যবসায়ীদের সুরক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা নেন। সেনাসমর্থিত ওই সরকারের সময় ব্যবসায়ীদের সুরক্ষায় বেটার বিজনেস ফোরাম গঠনে মূল ভূমিকা পালন করেন। তাঁর মেয়াদকালে ৫২টি জেলা চেম্বারের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ের জন্য সরকার কর্তৃক বরাদ্দ দেওয়া অর্থ থেকে চেম্বারের জন্য জমি ক্রয়সহ ভবন নির্মাণ, ভবন মেরামত ও সংস্কার এবং অফিস ইক্যুইপমেন্ট ও ফার্নিচার প্রদান করা হয়। ফেডারেশন ভবনের আধুনিকায়নের ছোঁয়া আছে শুধু তিনি নেই!

আনিস ভাইয়ের অন্যতম অর্জন হচ্ছে, সভ্য নগর ধারণাকে উন্মুক্ত করা। ঢাকা ভবনের জঙ্গল হিসেবে পরিচিত। রাস্তার দুই পাশে তাকালেই দালানকোঠার সমাহার। একটি বাড়ি থেকে আরেকটি বাড়ির মাঝখানে ফাঁকা নেই। অগ্নিনির্বাপকদের প্রবেশের ব্যবস্থা নেই। শিশুদের খেলার মাঠ নেই। আলো-বাতাস ঢোকার ব্যবস্থা নেই। ইমারত তৈরি করে সূর্যের আলো আর মুক্ত হাওয়া প্রবেশপথে সিল মেরে দেওয়া হয়েছে। অক্সিজেন উৎপাদনকারী বৃক্ষরাজি কেটে ফেলা হয়েছে বহু আগেই। খাল-পুকুর, দীঘি ভরাট করে, মাঠ দখল করে নির্মিত হয়েছে বহুতল অট্টালিকা। শহরের সৌন্দর্য এবং স্বাস্থ্যের চেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে অর্থ। আনিস ভাই বিষয়টি শুরুতেই উপলব্ধি করে নগরে সভ্যতা আনার চেষ্টা করেছিলেন। নমুনা হিসেবে গুলশান এলাকাকে সাজিয়ে ছিলেন। সুদৃশ্য বৃক্ষরাজি দ্বারা সবুজায়ন তাঁর অন্যতম কীর্তি। এয়ারপোর্ট রোর্ডের সারি সারি বনসাই নীরবে যেন তাঁর কথাই বলছে। তাঁর ভূমিকা মানুষকে নাড়িয়ে ছিল বলেই মৃত্যুতে অগণিত মানুষের অশ্রুপাত।

সিটি করপোরেশনের নির্মাণকাজের গুণগতমান নিয়ে প্রশ্ন ছিল সব সময়ই। তিনি নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করলেন তাঁর নিজস্ব তদারকি দ্বারা। স্বল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে দিলেন। যার স্বাক্ষর বহন করছে সড়কগুলো। সিটি করপোরেশন থেকে ঘুষ, দুর্নীতির মূল উৎপাটন, বিল আটকিয়ে অর্থ আদায় রুখে দিয়েছিলেন। তিনি সাহস দেখিয়েছিলেন নানাভাবে। তাঁর জীবন ছিল উচ্চগতির। নগরব্যাপী সিসি টিভি স্থাপন, বনায়ন, ঢাকাকে যানজটমুক্ত করার পরিকল্পনা, বর্জ্য অপসারণে আধুনিক ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন টয়লেট—স্বল্প সময়ে এমন আরও অনেক কিছু। তিনি পরিকল্পনাগুলো কাগজে আঁকার পাশাপাশি মনেও রাখতেন। ঢাকাকে তার জীর্ণ দশা থেকে তুলে আনতে কাজে নেমে পড়েছিলেন। তেজগাঁও ট্রাক টার্মিনালের সামনের রাস্তা থেকে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে জনগণের পথ জনগণকে ফিরিয়ে দেন। তার আগে মানুষের পক্ষে হেঁটে ওই পথে চলাফেরা করা ছিল দুঃসাধ্য। গাবতলী বাসস্ট্যান্ড বেদখল থেকে মুক্ত করা কিংবা বিলবোর্ড অপসারণ, শক্তিধর রাষ্ট্রের দূতাবাসের কবল থেকে সরকারি জমি উদ্ধার আর কত–কী। নগরকে পরিচ্ছন্ন রাখতে তিনি হাতে নেন পাঁচ হাজার ডাস্টবিন বসানোর কাজ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন, ড্রেনেজব্যবস্থা নির্মাণ, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থায় উন্নতি ঘটান।

যে প্রিয় নগরকে ভালোবেসে এই নগরীর দুঃখ ঘোচাতে চেয়েছিলেন, সেই নগরীর মাটিতেই শেষ আশ্রয় নিলেন প্রিয় আনিস ভাই। এই নগরীর সমস্যা বিস্তর, মানুষ ভেবেছে কখনোই এ সমস্যা লাঘব করার মতো আর কাউকে পাওয়া যাবে না। কিন্তু আনিসুল হক দৃঢ়প্রত্যয় নিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। এক অনির্বাণ উদ্যমে দিনভর কাজ করে প্রমাণ করেছিলেন হাজারো সমস্যায় আক্রান্ত মহানগরীর নিত্য দুঃখ দূর করা সম্ভব। আস্তে আস্তে সেসব কাজের নজিরও তিনি স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু মেয়র আনিসুল হক আরাধ্য কাজ শেষ করতে পারলেন না। তাঁর মেয়াদের বড় অংশ অপূর্ণ রেখেই অপ্রত্যাশিতভাবেই বিদায় নিলেন। আমরা কি তাঁর অসমাপ্ত কাজ শেষ করার সুযোগ তৈরি করতে পারব। সেটাই একটা বড় প্রশ্ন, একটা বড় চ্যালেঞ্জ। আনিসুল হক সবার জন্য সেই চ্যালেঞ্জ রেখে গেলেন।

ইতিহাসে এমন কর্মবীর বারবার আসে না। যাঁরা আসেন, তাঁরা শূন্য থেকে শুরু করে পূর্ণ করে দেন চারপাশ। আনিসুল হক ছিলেন তেমনি একজন, যিনি যেখানেই হাত দিয়েছেন, সোনা ফলিয়েছেন। মানুষকে কর্মমুখর করেছেন। সৃষ্টি ও সমৃদ্ধিতে ভরে দিয়েছেন সবকিছু। তিনি বস্তুত ছিলেন তেমনই একজন বিরল ব্যক্তিত্ব, যে ব্যক্তিত্ব মানুষকে কাছে টানত। আলোকিত ও উদ্ভাসিত করত। যাঁরাই তাঁর কাছে আসার সুযোগ পেয়েছেন, তাঁরা নিজেকে গড়তে পেরেছেন।

সৃষ্টিশীল মানুষেরা কখনো মরেন না। তিনি পেছনে রেখে গেছেন পরিশ্রমী, বর্ণাঢ্য এক জীবন। যে জীবন উৎসর্গিত হয়েছিল মানুষের জন্য। আনিসুল হক কর্মের ভেতর দিয়ে জীবনকে মহিমান্বিত করে গেছেন। তিনি তাঁর কর্মের মাধ্যমে আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। তাঁর কর্মের ইতিহাস রচনার সাক্ষী হতে পেরে আমরা ধন্য।

আজও তোমার জন্য মানুষ অশ্রুপাত করে। এখানেই তো জীবনের সার্থকতা। তোমার এই সার্থক জীবন যদি একবার দেখতে। আর আমরা দেখতাম তোমাকে। সেই দেখা কি আর হবে!

 

সুত্র:প্রথম আলো অনলাইন

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here