তসলিমা নাসরিন এর জীবনী

0
42

তসলিমা নাসরিন:
বাংলাদেশের একজন সাহিত্যিক ও চিকিৎসক। তার প্রকৃত নাম নাসরিন জাহান তসলিমা।
বিংশ শতাব্দীর ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের ২৫শে আগস্ট তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের ময়মনসিংহ শহরে,
নাসরিন জাহান তসলিমা জন্ম গ্রহন করেন।দুই ভাই দুই বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তাঁর পিতা রজব আলী পেশায় চিকিৎসক ছিলেন। মা ইদুল আরা সাধারণ ধর্মভীরু বাঙ্গালী গৃহিনী, ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে তসলিমা নাসরিন ময়মনসিংহ রেসিডেন্সিয়াল স্কুল থেকে মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পাস করেন। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি আনন্দ মোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পাস করেন। এরপর তিনি ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে এমবিবিএস পাস করেন।[৫] ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে তিনি সরকারী গ্রামীণ হাসপাতালে এবং ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মিটফোর্ড হাসপাতালে স্ত্রীরোগ বিভাগে ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (ঢামেকহা) তে অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগে চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
বৈবাহিক জীবন: ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দে তিনি কবি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ’র প্রেমে পড়েন এবং বাবা-মা ও আত্মীয়-স্বজন কাউকে না জানিয়ে গোপনে বিয়ে করেন। এর পর আবার ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। পরে বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক ও সম্পাদক নাইমুল ইসলাম খানের সাথে বিয়ে হয় এবং ১৯৯১ সালে তাদের আবার বিচ্ছেদ হয়। আবর তিনি ১৯৯১ সালে সাপ্তাহিক বিচিন্তা’র সম্পাদক মিনার মনসুরকে বিয়ে করেন এবং ১৯৯২ সালে তাদের বিবাহ আবার বিচ্ছেদ হয়। এরপর তিনি আর বিয়ে করেন নি।তার কোন সন্তানাদি নেই। তিনি বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যুগল জীবন যাপন করেছেন। তিনি একজন উভকামী। প্যারিসে অবস্থান কালে একজন ফরাসী মেয়ের সঙ্গে যৌন জীবনযাপনের বিবরণ হয় তাঁর।

সাহিত্য জীবনী: তেরো বছর বয়স থেকে তসলিমা কবিতা লেখা শুরু করেন। কলেজে পড়ার সময় ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি সেঁজুতি নামক একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তসলিমার কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে শিকড়ে বিপুল ক্ষুধা নামক তাঁর প্রথম কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে ও ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে আমার কিছু যায় আসে না কাব্যগ্রন্থগুলি প্রকাশিত হয়। এই সময় তসলিমা ঢাকা হতে প্রকাশিত নঈমুল ইসলাম খান দ্বারা সম্পাদিত খবরের কাগজ নামক রাজনৈতিক সাপ্তাহিকীতে নারী অধিকার বিষয়ে লেখা শুরু করেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ও সংবাদপত্রের কলামে নারীদের প্রতি মুসলিম মৌলবাদীদের শোষণের কথা লেখায় ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের মৌলবাদীরা এই পত্রিকার অফিস ভাঙচুর করে। এই সময় নির্বাচিত কলাম নামক তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধসঙ্কলন প্রকাশিত হয়, যার জন্য ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে তসলিমা আনন্দ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে অতলে অন্তরীণ, বালিকার গোল্লাছুট ও বেহুলা একা ভাসিয়েছিল ভেলা নামক আরো তিনটি কাব্যগ্রন্থ; যাবো না কেন? যাব ও নষ্ট মেয়ের নষ্ট গল্প নামক আরো দুইটি প্রবন্ধসঙ্কলন এবং অপরপক্ষ, শোধ, নিমন্ত্রণ ও ফেরা নামক চারটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়।
১৯৯৩ খ্রিস্টাব্দে লজ্জা নামক তাঁর পঞ্চম উপন্যাস প্রকাশিত হয়। এই উপন্যাসে বাংলাদেশের মুসলিমদের দ্বারা একটি সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবারের ওপর অত্যাচারের বর্ণনা করা হয়।এই উপন্যাসটি প্রকাশের পর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় মুসলিম মৌলবাদীরা তসলিমার ওপর শারীরিক ভাবে নিগ্রহ করে ও তাঁর এই উপন্যাস নিষিদ্ধ ঘোষণা করার দাবী জানায়। গ্রন্থমেলা কর্তৃপক্ষ তাঁকে মেলায় প্রবেশ করতে নিষেধ করেন। এই বছর অক্টোবর মাসে কাউন্সিল অব ইসলামিক সোলজার্স নামক এক মৌলবাদী সংগঠন তাঁর বিরুদ্ধে ফতোয়া জারি করে।
তসলিমা নাসরিনের সাতটি আত্মজীবনী গ্রন্থের অধিকাংশ বাংলাদেশ ও ভারত সরকার দ্বারা নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হয়। আমার মেয়েবেলা নামক তাঁর প্রথম আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থে ইসলাম ও মুহাম্মাদের প্রতি বিতর্কিত মন্তব্যের কারণে ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হলেও ২০০০ খ্রিস্টাব্দে এই বইয়ের জন্য তসলিমা দ্বিতীয়বার আনন্দ পুরস্কার জয় লাভ করেন।২০০২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর দ্বিতীয় আত্মজীবনী উতাল হাওয়া বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হয়।২০০৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর তৃতীয় আত্মজীবনী বাংলাদেশ উচ্চ আদালত কর্তৃক নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। পশ্চিমবঙ্গে এই বইটি দ্বিখন্ডিত নামে প্রকাশিত হলেও ভারতীয় মুসলিমদের একাংশের চাপে নত হয়ে পশ্চিমবঙ্গে বইটি নিষিদ্ধ হিসেবে ঘোষিত হলে সরকারের এই সিদ্ধান্ত লেখক মহলে তীব্রভাবে সমালোচিত হয়। এই নিষেধাজ্ঞা ২০০৫ খ্রিস্টাব্দ পর্য্যন্ত বলবৎ ছিল। ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে সেই সব অন্ধকার নামক তাঁর চতুর্থ আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
দেশত্যাগ: ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার এক সাক্ষাৎকারে তিনি ইসলামি ধর্মীয় আইন শরিয়া অবলুপ্তির মাধ্যমে কুরআন সংশোধনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন।এর ফলে ইসলামি মৌলবাদীরা তাঁর ফাঁসির দাবী জানাতে শুরু করে। তিন লাখ মৌলবাদী একটি জমায়েতে তাঁকে ইসলামের অবমাননাকারী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দালালরূপে অভিহিত করে। দেশ জুড়ে তাঁর শাস্তির দাবীতে সাধারণ ধর্মঘট ডাকা হয়। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে জনগণের ধর্মীয় ভাবনাকে আঘাত করার অভিযোগে মামলা শুরু করা হয় এবং জামিন অযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। গ্রেপ্তারী এড়াতে পরবর্তী দুই মাসে লুকিয়ে থাকার পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে তাঁর জামিন মনজুর করা হয় এবং তসলিমা নাসরিন বাংলাদেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
তসলিমা নাসরিন এর নির্বাসিত জীবন: বাংলাদেশ থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর তিনি ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে সুইডেনে ও ১৯৯৫ থেকে ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জার্মানিতে বসবাস করেন।১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি সুইডেন ফিরে গেলে রাজনৈতিক নির্বাসিত হিসেবে জাতিসংঘের ভ্রমণ নথি লাভ করেন। এই সময় তিনি সুইডেনের নাগরিকত্ব লাভ করেন ও সুইডিশ কর্তৃপক্ষের নিকট তাঁর বাংলাদেশের পাসপোর্ট জমা দেন। ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন। এই সময় তাঁর মা অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি বাংলাদেশ সরকারের নিকট দেশে ফেরার অনুমতি চেয়ে ব্যর্থ হলে তিনি জাতিসংঘের ভ্রমণ নথি ত্যাগ করে সুইডিশ কর্তৃপক্ষের নিকট হতে তাঁর বাংলাদেশের পাসপোর্ট ফেরত পান ও বিনা অনুমতিতে বাংলাদেশ প্রবেশ করেন। বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে পুনরায় জামিন-অযোগ্য গ্রেপ্তারী পরোয়ানা জারি হলে তিনি পুনরায় দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ১৯৯৯ থেকে ২০০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তিনি ফ্রান্সে বসবাস করেন।
দীর্ঘ ছয় বছর অপেক্ষার পর ২০০০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভারতে প্রবেশ করার ভিসা সংগ্রহ করতে সমর্থ হলে তিনি কলকাতা যাত্রা করেন। এর পর তিনি শোধ নামক তাঁর একটি উপন্যাসের মারাঠি ভাষায় অনুবাদকর্মের প্রচারে মুম্বই শহরে পৌঁছনোর সময় মুসলিম মৌলবাদীরা তাঁকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার হুমকি দেন। ২০০২ খ্রিস্টাব্দে তসলিমার পিতা মৃত্যুশয্যায় শায়িত হলে তসলিমার আবার বাংলাদেশে প্রবেশে করেন এর পর আবার ২০০৪ খ্রিস্টাব্দে ভারত সরকার তাঁকে অস্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি দেয় তসলিমাকে। কলকাতা শহরে বসবাস শুরু করেন তিনি ।

গ্রন্থ তালিকা:

কবিতা
• শিকড়ে বিপুল ক্ষুধা, ১৯৮১
• নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে, ১৯৮৯
• আমার কিছু যায় আসে না , ১৯৯০
• অতলে অন্তরীণ, ১৯৯১
• বালিকার গোল্লাছুট, ১৯৯২
• বেহুলা একা ভাসিয়েছিল ভেলা, ১৯৯৩
• আয় কষ্ট ঝেঁপে, জীবন দেবো মেপে, ১৯৯৪
• নির্বাসিত নারীর কবিতা, ১৯৯৬
• জলপদ্য, ২০০০
• খালি খালি লাগে, ২০০৪
• কিছুক্ষণ থাকো, ২০০৫
• ভালোবাসো? ছাই বাসো!, ২০০৭
• বন্দিনী, ২০০৮
• নির্বাচিত কলাম, ১৯৯০
• যাবো না কেন? যাব, ১৯৯১
• নষ্ট মেয়ের নষ্ট গল্প, ১৯৯২
• ছোট ছোট দুঃখ কথা, ১৯৯৪
• নারীর কোন দেশ নেই, ২০০৭
• নিষিদ্ধ, ২০১৪
• তসলিমা নাসরিনের গদ্য পদ্য, ২০১৫

উপন্যাস

• অপরপক্ষ ১৯৯২
• শোধ, ১৯৯২
• নিমন্ত্রণ, ১৯৯৩
• ফেরা , ১৯৯৩
• লজ্জা, ১৯৯৩
• ভ্রমর কইও গিয়া, ১৯৯৪
• ফরাসি প্রেমিক ,২০০২
• শরম,২০০৯

ছোট গল্প

• দু:খবতী মেয়ে, ১৯৯৪
• মিনু, ২০০৭

আত্মজীবনী
• আমার মেয়েবেলা, ১৯৯৯
• উতাল হাওয়া, ২০০২
• সেই সব অন্ধকার, ২০০৪
• আমি ভালো নেই, তুমি ভালো থেকো প্রিয় দেশ, ২০০৬
• নেই, কিছু নেই, ২০১০
• নির্বাসন, ২০১২

চলচ্চিত্র
তসলিমা নাসরিনের জীবনভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র নির্বাসিত ২০১৪ সালে মুম্বাই চলচ্চিত্র উৎসবে মুক্তি পায়। ২০১৫ সালে এই চলচ্চিত্রটি শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্র বিভাগে ৬২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছে।

পুরস্কার ও সম্মাননা

তসলিমা তার উদার ও মুক্তচিন্তার মতবাদ প্রকাশ করায় দেশ-বিদেশ থেকে একগুচ্ছ পুরস্কার ও সম্মাননা গ্রহণ করেছেন। সেগুলো হলো –
• আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার, ১৯৯২ এবং ২০০০।
• নাট্যসভা পুরস্কার, বাংলাদেশ, ১৯৯২
• ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট কর্তৃক শাখারভ পুরস্কার, ১৯৯৪
• ফ্রান্স সরকার প্রদত্ত মানবাধিকার পুরস্কার, ১৯৯৪
• ফ্রান্সের এডিক্ট অব নান্তেস পুরস্কার, ১৯৯৪
• সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল পেন কর্তৃক কার্ট টুকোলস্কি পুরস্কার, ১৯৯৪
• যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস্ ওয়াচ কর্তৃক হেলম্যান-হ্যামেট গ্রান্ট সম্মাননা, ১৯৯৪
• নরওয়েভিত্তিক হিউম্যান-এটিস্ক ফরবান্ড কর্তৃক মানবতাবাদী পুরস্কার, ১৯৯৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here